![]() |
|
|
|
Search |
|
|||||
|
|
|||||||||||||||||||||||||||||||||
|
অতিথী কলাম সাদাসিধে কথা মুহম্মদ জাফর ইকবাল ডিসেম্বর মাসটা একটু অন্য রকম৷ আমরা যারা সত্যিকারের বিজয় দিবসটা দেখেছিলাম, এই মাসে সেই ঐতিহাসিক এবং প্রায় অলৌকিক সেই দিনটির কথা ঘুরে- ফিরে বারবার আমাদের মনে পড়বেই৷কী তীব্র ছিল সেই আনন্দের অনুভূতি! আমার মনে হয়, আমরা বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান জাতিগুলোর একটি৷ একজন মানুষ তার জীবদ্দশায় এ রকম তীব্র আনন্দ আর কোনভাবে কি অনুভব করতে পারে? ডিসেম্বর মাসটা একটু অন্য রকম৷ কারণ এমাসে মন্ত্রী না হয়েও গাড়িতে পতাকা লাগানো যায়৷ আমাদের দেশের মন্ত্রীরা অবশ্য খুব অনুকরণীয় চরিত্র নন, তাঁদের অনেকেই এখন কারাগারে৷ আদর্শীক কোন কারণে নয়, টাকা-পয়সা চুরির অভিযোগে৷ যাঁরা গাড়িতে পতাকা লাগান, তাঁরা সেটি করেন নিজের দেশের প্রতি এক মমতা থেকে, এই পতাকার জন্য যত মানুষ আত্বত্যাগ করেছে, বুকের রক্ত দিয়েছে, পৃথিবীর বেশীর ভাগ দেশে তত মানুষই নেই!ডিসেম্বর মাসটা একটা অন্য রকম৷ তার কারন, এই মাসটাতে শুধু যে বিজয় দিবস আছে তা নয়, এই মাসটাতে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস বলেও একটা দিবস আছে৷ আমাদের মনে হয়, এই মাস সেদিনের ঘটনা, যেদিন মুক্ত বাংলাদেশের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে খবর পেয়েছিলাম এই দেশের সব বড় বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষককে রাতের অন্ধকারে ধরে নিয়ে গেছে আলবদরের দল৷ তখনো সবাই ভাবছে, তাঁদের বুঝি কোথাও আটকে রাখা হয়েছে, খুঁজে পাওয়া যাবে৷ খুঁজে সত্যিই পাওয়া গেল, তবে হাত-পা বাঁধা অবস্থায়,বধ্যভূমিতে,মৃত৷ হ্যাঁ, এটি সেই বদর বাহিনী, যে বদর বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদ৷ হ্যাঁ, ডিসেম্বর মাসটা একটু অন্য রকম৷ সারা বছর মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা মনে না করলেও যে মাসে সবাই একবার হলেও মনে করে৷ এই দেশে এখনো যে সব রাজাকার ঘুরে বেড়ায়, তারা এই ডিসেম্বর মাসে র্গেত লুকিয়ে থাকে৷ চট করে তারা মাথা বের করে না, তারা মুখ খোলে না৷
২. এই বছরে যে সব বড় কাজ হয়েছে, আমার মনে হয় তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচেছ আমাদের স্কুলের ছেলেমেয়ের পাঠ্য বইগুলোতে দেশের সত্যিকারের ইতিহাস তুলে ধরা৷ শেষ পর্যন্ত পাঠ্য বইয়ে জাতির জনক এবং বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর নাম ঢোকানো হয়েছে৷ বেঁচে থাকতে থাকতে জিয়াউর রহমান যে দাবি করেছিলেন, ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নামে তিনি পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষনাপত্রটি পাঠ করেছিলেন, সেই কথাটিও এসেছে৷ একাত্তুরের নয় মাস যে রাজাকার,আলবদর, আল-শামসরা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সেটা পাঠ্যবই থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল; সেই সত্য গুলো আবার পাঠ্য বইয়ে নতুন করে লেখা হয়েছে৷ এই সরকারের অনেক কিছু নিয়েই আমাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে, অনেক কিছু নিয়ে আমাদের আশাভঙ্গও হয়েছে৷ কিন্তু পাঠ্য বইগুলোতে সত্যিকারের ইতিহাসকে পুন:প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই৷ এই দেশটা এমন একটা জায়গায় পৌছে গিয়েছে যে আমরা আর কাউকেই সাদা চোখে বিচার করতে পারি না৷ মানুষটার মুখের কথা শুনে আমরা অনুমান করার চেষ্টা করি সে কী আওয়ামীপন্থী নাকি বিএনপি-জামায়াতপন্থী! বিভক্তিটা এমন একটা জায়গায় পৌছে গিয়েছে যে কেউ খোদা হাফেজ বলছে না, আল্লাহ হাফেজ বলছে, সেই কারনটাও খুঁজে বের করার চেষ্টা করি৷ এ রকম অবস্থায় একটা রাজনৈতিক সরকার তার আমলে পাঠ্য বইয়ে ১০০ভাগ সত্যি কথা লিখলেও অনেক মানুষ সেই কথাগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য খঁুজে পাওয়ার চেষ্টা করত৷ এই সরকারের সেই সমস্যা নেই৷ তারা ইতিহাসের যে কথাগুলো পাঠ্য বইয়ে লিখে যাবে, তার একটা গ্রহনযোগ্যতা থাকবে৷ আমার ধারনা এটি একটি অত্যন্ত কঠিন সমস্যার চমৎকার একটা সমাধান হয়ে রইল৷ পাঠ্য বইগুলো আমি এখনো নিজের চোখে দেখিনি, পত্রপত্রিকা পড়ে এগুলো সম্র্পেক জেনেছি৷ কাজেই আরও কী কী লেখা আছে তা আমি জানি না৷ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়টাতে পাকিস্তান সরকার বঙ্গদ্ধুকে পাকিস্তানের কারাগারে আটক করে রেখেছিল৷ সেই সময় তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন৷ দেশের মানুষকে স্বাধীনতার জন্য সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর অবদান যে রকম কেউ অস্বীকার করতে পারবে না, ঠিক সে রকম নয় মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বকেও কেউ অস্বীকার করতে পারবে না৷ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের পাঠ্য বইয়ে এই ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরা খুব প্রয়োজন৷
৩. আদালতে মামলা উঠছে, আমরা দেখতে পাচিছ সেখানে কোন অভিযোগ প্রমান করা যাচেছ না৷ তার পরও তাদের দুই-তিন বছর জেল হয়ে যাচেছ৷ কারও মনে কোনো দ্বিধা নেই যে পুরো ব্যাপারটা এক ধরনের হয়রানি৷ বেছে বেছে কেন ছাত্র আর শিক্ষকদের হয়রানি করার জন্য বেছে নেওয়া হলো, সেটাও আমরা কেউ বুঝতে পারছি না৷ বিশ্ববিদ্যালযে নানা ধরনের শিক্ষক থাকেন, সকল হয়রানি বেছে বেছে প্রগতিশীল শিক্ষকদের বিরুদ্ধে৷ মনে হচেছ, আমরা বুঝি দুই হাজার সাত সালে নই, আমরা বুঝি আছি আইয়ূব খান-মোনায়েম খানের আমলে৷ শিক্ষক-ছাত্র নিগ্রহের নাটক এখনো শেষ হয়নি৷ রাজশাহীর শিক্ষকেরা ছাড়া পেয়েছেন, ঢাকার শিক্ষকেরা এখনো ছাড়া পাননি৷ মনে হচেছ, তাঁদের দিয়ে মুচলেকা লিখিয়ে এক ধরনের অসম্মান করানোর খুব ইচেছ৷ সেটা যদি সম্ভব না হয়, অন্তত তাঁদের একটা শাস্তি দিয়ে তারপর দয়া করে ক্ষমা করে দেওয়ার এক ধরনের নাটক করা হতে পারে৷ আমরা সবাই খুব কৌতুহল নিয়ে এই নাটক দেখছি, শেষ দৃশ্যে কী অভিনয় হবে, কেউ এখনো আন্দাজ করতে পারছি না৷
৪.
৫. এখন এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই! বিষয়টার গুরুত্ব আর বেড়েছে৷ কারণ,জেনারেল মইন উ আহমেদ এবং প্রধান উপদেষ্টা ফকরুদ্দিন আহমদ-দুজনেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথাটা বিবেচনায় এনেছেন৷ দেশের মানুষ এক ধরনের আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে দেখার জন্য শেষ পর্যন্ত কী হয়৷ কয়েক দিন আগে আমার কাছে একটা ই-মেইল এসেছে৷ যেখানে দুটি লিংক আছে-ইন্টানেটে সেই লিংকে ক্লিক করা মাত্রই আমি দুটো ভিডিও ছবি দেখতে পেলাম৷ দুটি ভিডিওই স্বাধীনতাযুদ্ধে বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের অনুষ্ঠান এবং সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও৷ একটাতে দেখতে পেলাম, বদর বাহিনীর কমান্ডার মতিউর রহমান নিজামী ও সে ধরনের কিছু মানুষের পাশে আমাদের আইন উপদেষ্টা ব্যারিষ্টার মইনুল হোসেন বসে আছেন৷ দেখে আমার নিজের চোখকে বিশ্বাস হয় না৷ আমার খুব জানার কৌতুহল, কী কারনে তিনি সেখানে গিয়ে বসে ছিলেন৷ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি নিয়ে যখন জোর আলোচনা চলছে, তখন হঠাৎ একদিন শুনতে পেলাম তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বলছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা মোটেও তাঁদের দায়িত্ব নয়৷ সত্যি কথা বলতে কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাচনের ব্যবস্থা করা ছাড়া আর কিছুই করার কথা নয়৷ কিন্তু তারা বিচার বিভাগের পৃথককরণ সম্পন্ন করেছে (যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকের বিচার প্রক্রিয়া দেখে সেটা এ মুহূর্তে কারও বিশ্বাস হচেছ না) পাঠ্যপুস্তকগুলোর সংস্কার করেছে, দু-দুজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে জেলে আটকে রেখেছে, ডজন ডজন মন্ত্রী এবং ‘রাজপুত্র'দের দুর্নীতির জন্য বিচার করছে৷ এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার কাজটি তাদের জন্যই সবচেয়ে সহজ৷ দেশের মানুষ তাদের কাছেই এটা আশা করে৷ তবে মতিউর রহমান নিজামীর সঙ্গে এক টেবিলে বসে থাকা ব্যারিষ্টার মইনূল হোসেনকে দেখে আমি একটা বড় ধাক্কা খেয়েছি৷ দ্বিতীয় ভিডিওটি দেখে আমি চমকে উঠেছি, সেখানে ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসে আছেন আমাদের নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন৷ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব একটি এবং একটি৷ সেটি হচেছ নির্বাচন করা৷ সেই নির্বাচনের জন্য কি বেছে নিতে হলো এমন একজন মানুষকে, যিনি স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত? বিজয়ের মাসে আমরা কি সে জন্য আমাদের আশাভঙ্গের বেদনাটুকু এই সরকারকে জানাতে পারি না? (যাঁরা ভিডিও গুলো দেখতে চান, তাঁরা এই লিংগুলোতে একবার ক্লিক করে দেখতে পারেন: http://ww.wyoutube.com/awtch?v=Zc2djYrzjoY
|
||||||||||||||||||||||||||||||||||
|
|
|
|
|
|
||||||||
|
©2007 Porobash. Privacy Policy |
||||||||||||